ধর্ষণ এর সংজ্ঞা
ধর্ষণ শব্দের অর্থ হল অত্যাচার, বলৎকার । আরবীতে যার প্রতিশব্দ হলো ‘ইগতিসাব’ যার শব্দমুল ‘গসব’ অভিধানে এর বিভিন্ন অর্থ পরিদৃষ্ট হয়। ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো 'Rape’ সুতরাং ধর্ষণ হলো যৌন চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে কোন পুরুষ কোন নারীকে তার সম্মতি ব্যাতিত তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সহবাস করাকে ধর্ষণ বলে। ড. আলী আহমাদ ইয়াহইয়া আল-ক্বা’ঈদী বলেন, “বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে জোরপূর্বক অবৈধ যৌণসঙ্গোমকে প্রচলিত অর্থে ধর্ষণ বলা হয়। আর এভাবে কাউকে ব্যভিচার ও সমকামিতয় বাধ্য করাকেও ধর্ষণ বলে”
ধর্ষণের ফলশ্রতিতে জন্মলাভকারী শিশু সংক্রান্ত বিধান
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সর্বশেষ সংশোধিত ২০২০) এর ধারা ১৩ (১) মতে-অন্য কোন আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, ধর্ষণের কারণে কোন সন্তান জন্মলাভ করিলে-
(ক) উক্ত সন্তানকে তাহার মাতা কিংবা তাহার মাতৃকুলীয় আত্মীয় স্বজনের তত্তাবধানে রাখা যাইবে;
(খ) উক্ত সন্তান তাহার পিতা বা মাতা, কিংবা উভয়ের পরিচয়ে পরিচিত হইবার অধিকারী হইবে;
(গ) উক্ত সন্তানের ভরণপোষণের ব্যয় রাষ্ট্র বহণ করিবে;
(ঘ) উক্ত সন্তানের ভরণপোষণের ব্যয় তাহার বয়স একুশ বৎসর পূর্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রদেয় হইবে, তবে একুশ বৎসর অধিক বয়স্ক কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে তাহার বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত এবং পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে তিনি স্বীয় ভরণপোষণের যোগ্যতা অর্জন না করা পর্যন্ত প্রদেয় হইবে;
ধারা ১৩ (২) সরকার বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত সন্তানের ভরণপোষণ বাবদ প্রদেয় অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করিবে।
ধারা ১৩ (৩) এই ধারার অধীন কোন সন্তানকে ভরণপোষণের জন্য প্রদেয় অর্থ সরকার ধর্ষকের নিকট হইতে আদায় করিতে পারিবে এবং ধর্ষকের বিদ্যমান সম্পদ হইতে উক্ত অর্থ আদায় করা সম্ভব না হইলে, ভবিষ্যতে তিনি যে সম্পদের মালিক বা অধিকারী হইবেন সেই সম্পদ হইতে উহা আদায়যোগ্য হইবে।
ধর্ষণ বা যিনার মাধ্যমে জন্ম লাভ করা অবৈধ সন্তানের শরয়ী বিধান
ইসলামী শরীয়া অনুযায়ী পর্দার বিধান পালনে অনিহা, নর-নারীর অবাধ মেলা-মেশা ও আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে ধর্ষণ, ইভটিজিং, যৌন নির্যাতন, যৌন নীপিড়নসহ নানাবিধ মানবতার সমস্যা ও নৈরাজ্য ক্রমবর্ধমান। বর্তমান সময়ে নারী-পুরুষের অবৈধ মিলন এবং ধর্ষণের ফলে জন্ম লাভ করা সন্তান একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে বিবেচিত। মার্জিত ভাষায় অবৈধ সন্তানকে ”অনাকাঙ্খিত সন্তান” এবং সাধারণভাবে ”জারজ সন্তান” বলা হয়। ধর্ষণ বা যেনার মাধ্যমে কোন সন্তান জন্ম লাভ করলে মুসলিম সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা, ভরণ-পোষণ, জন্ম পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়, অভিভাভকত্ব, উত্তরাধিকার লাভ, বিবাহ, মৃতু হলে গোসল, দাফন-কাফন, যানাযার সালাত আদায়, তার কবর স্থান নির্ধারণ সর্বপরি তার সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার ইত্যাদী বিষয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। সামাজিক জীবনের অন্যান্য সমস্যার সমাধানের মত ইসলামে আলোচ্য সমস্যারও বাস্তব, সুষ্ঠু, সর্বোৎকৃষ্ট ও মানবতাঘনিষ্ট সমাধান রয়েছে।
সন্তানের বৈধতা লাভের একমাত্র উপায় হলো স্বামী-স্ত্রীর বৈধ বিবাহ। এ জন্য ইসলাম অন্যান্য ধর্মমতে সম্পাদিত বৈধ বিবাহকে স্বীকৃতি প্রদান করে। অমুসলিমদের জন্য ইসলামী রীতি মেনে বিয়ে জরুরী নয়, শুধু মুসলিমরাই ইসলামী পদ্ধতি মেনে বৈধ ভাবে বিবাহ কার্য সম্পাদন করবে। মানবসন্তানের বংশ সংরক্ষণ ইসলামে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে অমুসলিমরা তাদেও নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি মেনে বিয়ে করলে ইসলাম সে বিয়েকেও বৈধতার সনদ প্রদান করে।
জারজ বা অবৈধ সন্তানের মা মুসলিম হলে উক্ত সন্তান মুসলমানদের সন্তানের মত মুসলিম পরিবারে লালিত-পালিত হবে মুসলিম হিসেবে ধর্মীয় পরিচিতি লাভ করবে। তার প্রতি কোন রকম অবজ্ঞা ও আচার-আচারনে, শিক্ষা-দীক্ষায় কোন রকম শৈথিল্য প্রদর্শণ না করে মার্জিত আচরণ ও সদ্ব্যবহার করতে হবে। তার পিতা-মাতার পাপাচারের কারণে তাকে দোষারোপ করা যাবে না। মহান আল্লাহর বাণী: এবং কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।
যিনা বা ধর্ষণের ফলে যদি সন্তান গর্ভে এসে যায় তবে রূহ আসার পর গর্ভপাত করা সম্পূর্ণ হারাম। কেননা, বৈধ দম্পতির গর্ভের ভ্রæণ রূহ আসার পর গর্ভপাতের মাধ্যমে হত্যাকে ’অন্যায় হত্যা’ বলাহয়, যা আল্লাহ হারাম করেছেন। সুতরাং অবৈধ মেলা-মেশার মাধ্যমে আসা গর্ভস্ত সন্তান হত্যা করা আরো বেশী গর্হিত হারাম হবে, এটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে গামিদিয়া মহিলার উদাহরণ বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য। হাদীসে এসেছে, গামিদিয়া গোত্রের কোন এক গর্ভবতী মহিলা নবী করীম সা. এর খেদমতে হাজির হয়ে ব্যভিচারের স্বীকৃতি দিয়েছিলো। তখন নবী সা. উক্ত মহিলাকে ফিরে যেতে বলেন এবং সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর আসতে বলেন। সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর আসলে নবী করীম সা. বললেন, তার ছোট শিশু সন্তানকে রেখে আমি তাকে রজম করতে পারি না। কেননা তার শিশু সন্তানকে দুধ পান করানোর মত কেউ নেই।
উক্ত হাদীস থেকে স্পষ্টত: বুঝাযয় যে, রাসূলুল্লাহ সা. উক্ত মহিলামে গর্ভপাত করার অনুমতি দেন নি এবং তার উপর হদ্দ (রজম) প্রয়োগ করেন নি; বরং তাকে ১ম বার সন্তান ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত এবং ২য় বার দুগ্ধ পানের মেয়াদ পর্যন্ত অবকাশ দেয়ার কথা বলেছিলেন। সুতরাং যেনা বা ধর্ষণের মাধ্যমে অবৈধভাবে গর্ভবতী হলে ভ্রণে রূহ আসার পর গর্ভপাত করা হারাম। গর্ভপাতের সুযোগ দেয়া হলে যিনা ও ধর্ষণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। সর্বপরি সন্তানের তো কোন দোষ নাই।
এরুপ সন্তানের জন্মগ্রহণ দুই অবস্থায় হতে পারে।
১. সন্তানটি জন্ম নেয়ার আগেই ব্যভিচারী ব্যভিচারিনীকে বিয়ে করে নিয়েছে। এক্ষেত্রে বিবাহের ছয় মাস পর জন্মগ্রহণ করলে উক্ত সন্তান স্বামী-স্ত্রীর বৈধ সন্তান হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।
এক্ষেত্রে তাদের শারীরিক সম্পর্ক কখন কিভাবে হয়েছে তা ধর্তব্য নয়। কারণ: তা অত্যন্ত গোপনীয় ও স্পর্শকাতর বিষয়। উল্লেখ্য যে, বিয়ের পওে যদি স্বামী ছাড়া অন্য কারো সাথে অবৈধ মিলনে কোন সন্তান জন্মলাভ করে, তবে উক্ত সন্তানের পিতৃত্বের সম্পর্ক স্ত্রীর বৈধ স্বামীর ধর্তব্য হবে। মহিলার বৈধ স্বামীই উক্ত সন্তানের বৈধ পিতা বিবেচিত হবে। এক্ষেত্রে সন্তানটিকে অবৈধ বলা যাবে না। মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. বলেছেন, বিছানা যার, সন্তান তার । অর্থাৎ সন্তান বৈধ স্বামীরই গণ্য হবে, আর ব্যভিচারী বঞ্চিত হবে।
সুতরাং এটা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, ইসলাম মানবসন্তানের বংশ সংরক্ষণে ও তাকে অসম্মানের হাত থেকে বাঁচাতে সর্বাধিক অগ্রাধিকার প্রদান করেছে এবং যে কোন সম্ভাবনায় বৈধতা দেয়ার ক্ষেত্রে সীমাহীন গুরুত্ব প্রদান করেছে। আলী ইবন আসীম ইমাম আবুহানিফা র. থেকে বর্ণনা করেন:
অর্থাৎ অবৈধ সঙ্গমের ফলে যদি গর্ভে সন্তান এসে যায়, তারপর যদি তারা একে অপরকে বিয়ে করে নেয়, তাহলে বিষয়টি গোপন করা এবং সন্তানটির পিতা উক্ত স্বামী; এ কথা বলার মাঝে আমি মন্দ কিছু দেখি না।
২. আর যদি ধর্ষণকারী ধর্ষিতাকে বা যিনাকারী যিনকারীনীকে বিয়ে না করে, অথবা বিয়ে করলেও বিয়ের আগেই ধর্ষিতা বা ব্যভিচারিনী সন্তান প্রসব করে দেয় তাহলে উক্ত সন্তান বৈধ সন্তান বলে বিবেচিত না হয়ে জারজ সন্তান হিসেবে বিবেচিত হবে। বিয়ের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পূর্বে জন্মলাভ করা সন্তানের বংশ পিতার সাথে নির্ধারণ হবে না এবং সে পিতার উত্তরাধিকার হবে না। তবে পিতা উক্ত সন্তানকে কিছু লিখে দিলে ভিন্ন কথা।
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সংক্ষিপ্তাকারে ধর্ষণ বা যিনার মাধ্যমে জন্মলাভ করা অবৈধ বা জারজ সন্তানের হুকুম তুলে ধরা হলো।
ক্স তার বংশ মায়ের থেকে সাব্যস্ত হবে। পিতা অবৈধ হওয়ায় তার সাথে সম্পর্কিত হবে না। সেজন্য এরুপ সন্তান পিতার বদলে শুধু মায়ের নাম ব্যবহার করবে।
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ قَامَ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ فُلاَنًا ابْنِى عَاهَرْتُ بِأُمِّهِ فِى الْجَاهِلِيَّةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ্র لاَ دِعْوَةَ فِى الإِسْلاَمِ ذَهَبَ أَمْرُ الْجَاهِلِيَّةِ الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ وَلِلْعَاهِرِ الْحَجَرُ গ্ধ .
আমর ইবনু শু’আইব রা. থেকে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক আমার পুত্র, জাহেলী যুগে আমি তার মায়ের সাথে যিনা করেছিলাম। রাসূল সা. বললেন: ইসলামে অবৈধ সন্তানের দাবীর কোন ব্যবস্থা নেই। আর জাহেলী যুগের প্রথা বাতিল হয়ে গেছে। বিছানা যার সন্তান তার এবং যিনাকারীর জন্য রয়েছে পাথর।
ক্স সন্তানের মা তার লালন-পালনের অধিকারী হবেন। মায়ের পক্ষ এমন সন্তানের ভরণ-পোষণ বহন করবে। অর্থৎ এ সন্তানের মায়ের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব যার, তিনিই সন্তানের ভরণ-পোষণ দিবেন।
ক্স মায়ের দায়িত্বশীলরা এরুপ সন্তানের আকিকা করবে। আকিকার ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে যাতে সন্তানের অমর্যাদা না হয়।
ক্স মায়ের দিকে বংশ সাব্যস্ত হওয়ায় সে শুধুমাত্র মা ও মায়ের নিকটাত্মীয়দের উত্তরাধিকারী হবে, হাদীসে এসেছে: জারজ সন্তান তার পিতার থেকে মীরাস লাভ করবে না ।
ক্স ন্যায় পরায়ণ হলে, অন্যদের মত তার সাক্ষীও ইসলামে গ্রহণযোগ্য হবে । কারণ তার পিতা-মাতার ফাসেকীর কারণে সে ফাসেক হিসেব গণ্য হবে না । মহান আল্লাহর বাণী: এক জন অন্য জনের বোঝা বহন করবে না । মহানবী সা. এরশাদ করেছেণ: জারজ সন্তান তিনটি মন্দের অন্যতম ।
ক্স অবৈধ সন্তানের পিতা-মাতা মুসলিম হলে সে সর্বসম্মত মতানুসারে মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে। উভয়ে যদি আলাদা ধর্মানুসারী হয়, তাহলে পিতা-মাতার মধ্যে যার ধর্ম সর্বোৎকৃষ্ট, শিশুকে সেই ধর্মের অনুসারী ধরা হবে । হাদীসে এসছে, ’সকল সন্তান স্বভাবধর্ম ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে’।
ক্স তাকে মুয়াজ্জিন বানানো যায়েজ, তবে উপযুক্ত অন্য কেউ থাকলে তাকে মুয়াজ্জিন নিয়োগ না দেয়াই উত্তম, কোন কোন আলিম মাকরুহ বলেছেন। সাধারণত: তাদের অভিভাভকত্বের ত্রæটির কারণে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দ্বীনী জ্ঞানার্জনে তারা সুশিক্ষিত হয় না। তাই এক্ষেত্রে অন্যরা প্রধান্য পাবে । ইমাম সারাখসী বলেন: আযান যেহেতু অনেক বড় জিকর, তাই এক্ষেত্রে কোন সম্মানিত ও বরকতপূর্ণ পূন্যবান লোককে নির্বাচন করতে হবে ।
ক্স জমহুর আলিমদের মতে, সঠিকভাবে ইমামতির সকল শর্ত পূরণ হলে তাকে ইমাম বানাতে কোন সমস্যা নেই। ইমাম আযম র., ইমাম শাফেয়ী র., মুজাহিদ র. ও ্ওমর ইবন আব্দুল আযীয রহ. এর মতে অবৈধ সন্তানের ইমামতি করা মাকরুহ। তবে হযরত আইশা রা. ইমাম আহমদ, আতা. সুলাইমান বিন মূসা, হাসান বসরী এবং ইব্রাহীম নখয়ী র. এর মতে সে যদি দ্বীনের উপর সন্তুষ্ট থাকে তবে মাকরুহ নয় ।
ক্স জারজ সন্তানকে ব্যভিচারীর সন্তান বলে গালি দেয় যাবে না, কেউ গালি দিলে ক্বযফ বা মিথ্যা অপবাদ হবে , তার উপর মিথ্যা অপবাদের জন্য হদ্দের শাস্তি প্রযোজ্য হবে ।
ধন্যবাদান্তে
Muhammad Ullah,
Advocate, Supreme Court of Bangladesh,
Head of Chamber "Muhammad Ullah and Associates",
Meherba Plaza, Suite No. 9/A,
(9th Floor) 33, Topkhana Road,
Purana Paltan, Dhaka-1000.
Email: mullahiuk@gmail.com,
Cell: 01719917214